বন্ধুত্বের হাত ধরে নরকের দরজায়: কুয়েটের শেষ কুড়ি দিনে এক স্বপ্নের নির্মম পতন
বন্ধুত্বের হাত ধরে নরকের দরজায়: কুয়েটের শেষ কুড়ি দিনে এক স্বপ্নের নির্মম পতন…..
আমারই দুই বন্ধু যখন আমার পথ আগলে দাঁড়ালো, আমি বিশ্বাস করতে পারিনি।
বিশ্বাস করতে পারিনি, চার বছর যাদের সাথে ঘুরেছি, প্রোজেক্টে হেল্প করেছি, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে তারা একদিন আমাকে জোর করে তুলে নিয়ে যাবে টর্চার সেলে।
ছাত্রলীগ হতে হলে অনেক কাজ করতে হয়, আমি জানতাম। শুধু জানতাম না যে ছাত্রলীগ করতে হলে এমনকি বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাও ভুলে যেতে হয়, বন্ধুকে নিয়ে যেতে হয় নরকের দরজায়।
ফিরোজ আর আশিকুর রহমান শোভন এই কাজটাই করেছিলো।
ওদের জন্যই মৃত্যুর আগেই আমার নরক দর্শন হয়ে গিয়েছিলো। তাও কুয়েট জীবন শেষ করার ২০ দিন আগে।
অবশ্য এই মারটা আমার ফার্স্ট ইয়ারেই খাওয়ার কথা ছিলো।
কুয়েটে ভর্তির পর যখন আকাশে উড়ছি পাখির মতো, তখন শিবিরের এক ভাইয়ের লিস্টে ২০ জনের সাথে সাথে আমার নামটাও পাওয়া গেল। কেন পাওয়া গেল, কীভাবে পাওয়া গেল, আমি জানি না।
শুধু জানি, সেদিন থেকেই আমি ছাত্রলীগের টার্গেট হয়ে গেছিলাম। ফার্স্ট ইয়ার হওয়াতে আমি মার খাইনি বটে, কিন্তু ক্যাম্পাসে আমার চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়। আমাকে কোথাও দেখা হলেই মারা হবে, কুয়েট ছাত্রলীগের এমন ঘোষণার পর আমি ২০ দিন ক্লাসে যাই নাই।
এক পর্যায়ে আমার বাবা কুয়েটে আসেন। এসে ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে অনেক অনুনয় বিনয় করে আমাকে ক্লাস করার "অনুমতি" নিয়ে দেন।
বাবার নিচু মাথা দেখে আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করে, এই রাষ্ট্র, এই ইউনিভার্সিটি আর এই সমাজের উপর আমার খুব অভিমান হয়।
অথচ কুয়েটে চান্স পাওয়ার পর বাবা কত গর্বই না করেছিলেন!!
স্বচ্ছল একটা পরিবারেই আমার জন্ম। মা বাবার আদেরেই বড় হয়েছি, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করেছি।
তবে ইন্টারে উঠে সেই স্বচ্ছলতার জীবনে প্রথম অস্বচ্ছলতার ছাপ পড়লো। ভেঙে পড়িনি, ভয়ও পাইনি। বাবা এতোদূর এনেছে, আমি বাকিটুকু যেতে পারবো না? টিউশনি করিয়ে নিজের খরচ চালানো শুরু করি। বড় ভাইদের সহযোগিতায় একটা কোচিং এ ভর্তি হই। রুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটি সবখানেই চান্স হয়।
কুয়েটে ১৫৬ তম স্থান অর্জন করে ভর্তি হই EEE ডিপার্টমেন্টে।
এই ভর্তি হওয়ার খবরে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন আমার বাবা। ভেবেছিলেন, ছেলে ভালো জায়গায় চান্স পেয়ে গেছে। আর কোন ভয় নাই।
অথচ সেই বাবাই এখন ছাত্রলীগের পোলাপাইনের সামনে চোখে মুখে ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যাতে তার ছেলেকে না মারা হয়, যেন তাকে ক্লাসের অনুমতি দেওয়া হয়।
কী যে এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার এই দেশে ছিলো, চিন্তাও করতে পারি না।
বাবার কাকুতি মিনতিতে ক্লাসের অনুমতি পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু টার্গেট আমি সবসময়ই ছিলাম।
ভয়টাও তাই সবসময়ই ছিলো।
তবে ফোর্থ ইয়ারের শেষের সীমানা যত আগাইয়া আসতে থাকে, আমার ভয়ও তত কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে আমার মনে হয়, ওরা সম্ভবত আমার কথা ভুলেই গেছে। শেষই তো হয়ে গেল, আর বোধহয় কোন সমস্যা হবে না।
৩০ জানুয়ারি, ২০১৮।
ক্লাস শেষ করে পরের ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে খিদা লেগে যায়। নাস্তার জন্য বের হয়ে পড়ি। মনে একইসাথে রোমাঞ্চ আর দুঃখ। রোমাঞ্চ, কারণ আর কিছুদিন পরেই আমি গ্র্যাজুয়েট হয়ে যাবো। শুরু হবে আমার নতুন জীবন।
আর দুঃখ কারণ, আর মাত্র ২০ দিন। তারপরেই আমার এই রঙবেরঙের কুয়েট জীবন শেষ।
তখনও জানতাম না, এই রঙবেরঙের কুয়েট জীবনে আজ ঠিক কত বড় কালো দাগ পড়তে যাচ্ছে।
ফিরোজ আর শোভনকে পথরোধ করতে দেখে আমি কোন বাঁধা দিই নি। শত্রুর সাথে জোর জবরদস্তি চলে, বন্ধুর সাথে লড়াই করি কী করে? ওরা আমাকে নিয়ে যায় বঙ্গবন্ধু হলের ৩০১ অথবা ৪০১ নাম্বার রুমে।
রুমটা ছিলো সভাপতি শোভনের।।
মারটাও সেই প্রথম শুরু করে। বন্ধুদের সাথে বুঝি এমনিই করার নিয়ম, কে জানে!!
এরপর একে একে আরো অনেকেই সেই উৎসবে যুগ দেয়। এর মধ্যে সভাপতি শোভন, সেক্রেটারি সেজান আর তরিকুল ইসলাম তিলক, এই তিনজন ছিলো সবচে বেশি আক্রমনাত্মক।।আরো ছিলো তারেক হাসান আর সামি। এরাই ছিলো মূলত কুয়েট ছাত্রলীগের পঞ্চপান্ডব। আপনি কুয়েটের প্রতিটা মারামারিতে আর টর্চারে এই ৫ জনের নাম পাবেন।
আর এদের মধ্যে সবচেয়ে পৈশাচিক জানোয়ারটার ন ছিলো সেজান। মারার সময় সে হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া ফেলতো। ২০১৭ তে এরা লুৎফর নামের একটা ছেলেকে এতোটাই নির্যাতন করে যে তাকে খুলনা মেডিকেলে নিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। এবং সেই মারের ভয়াবহতা দেখে মেডিকেলের নার্স পর্যন্ত হতবাক হয়ে গেছিলো।
আমাকে মারার জন্য ওদের কাছে স্ট্যাম্প, বেল্ট, লাঠি শোটা সবই ছিলো। বিশেষভাবে আনা হয়েছিলো পিভিসি পাইপ। এরপর আমার আঙুলগুলো সামনের টেবিলে রেখে আঙুলের উপর পাইপ দিয়ে পেটাতে থাকে। আমার আঙুলের সমস্ত হাড় ভেঙে যায়, অসহ্য ব্যথায় আমি কাতরাতে শুরু করি।
তবে আমার কাতরানো ওদের মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারলো না।
বরং কেউ একজন আমাকে এতোটাই জোরে থাপ্পড় মারলো যে আমি চেয়ার থেকে নিচে পড়ে যাই। এবং আমি আবিষ্কার করি,আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।।শুধু ওদের মুখ নাড়ানো বুঝতে পারি।
একইসাথে আমার চোখও অন্ধকার হয়ে আসে। আমি টলতে শুরু করি।
কিন্তু ওদের কাছে এসবই ছিলো নাটক। সো, আমার নাটক ছুটিয়ে দেওয়ার জন্য ওরা আবার মার শুরু করে। প্রশ্ন করে, উত্তর দেওয়ার আগেই মার শুরু করে। এক পর্যায়ে কে মারছে আর কে প্রশ্ন করছে, সেটা আলাদা করার ক্ষমতা চলে যায়। এমনকি দুইটা থাপ্পড় আলাদা করার সময়ও আমাকে দেওয়া হচ্ছিলো না।
মনে মনে ভাবছিলাম কেবল মৃত্যুর কথা। শুনেছি জাহান্নাম এতোটাই ভয়ঙ্কর যে মানুষ সেখানে নিজের মৃত্যু কামনা করবে। কিন্তু দুনিয়ার বুকে এ কোন জাহান্নাম, যেখানেও আমাকে মৃত্যুর অপেক্ষাই করতে হচ্ছে?
আমি যত কাতরাতে থাকি,ওদের চোখ মুখে তত আনন্দ ফুটে উঠতে দেখি। ওরা আরো দ্বিগুন উৎসাহে আমাকে পেটাতে থাকে।
এক পর্যায়ে শোভন আমার মাথায় পিস্তল ধরে গুলি করে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে।
অবশেষে বেলা তিনটার দিকে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তবে খালি খালি না। শোভনের পিস্তল থেকে একটা বুলেট আর হলের কাঠ কাটার কুড়ালটাও আমার সাথে দিয়ে দেওয়া হয়। যাতে নাশকতার মামলে দেওয়া সহজ হয়। পুলিশের চোখের সামনে পুরো ঘটনা ঘটলেও পুলিশ সম্ভবত মজাই পেয়েছিলো।।
গ্রেফতারের পর আমাদের প্রথম নেওয়া হয় হাসপাতালে। পরবর্তীতে দেওয়া হয় হাজতে। দুটো মামলা করা হয় আমার নামে। অস্ত্র মামলা আর নাশকতা মামলা। অস্ত্র মামলা এতোটাই হাস্যকর ছিলো যে জজ শুরুতেই বিরক্ত হয়ে নাকচ করে দেন। তবে নাশকতার মামলা এখনও চলছে। কুয়েট আমাকে ছাড়লেও আমার উপর নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে এই মামলাটা রয়ে গেছে আমার মাথার উপর। আরো কতদিন এই ঘানি আমাকে টানতে হবে, আমি জানি না।
রিমান্ড আবেদন করা হলে দুইদিনের রিমান্ডও আমাকে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ এইসময় খুব ভালো মানুষ সেজে এসে বলে, আমাদের যে কোন দোষ নাই, সেটা ওরা জানে। এবং টাকা পয়সা দিলে আমাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে। বারবার নিষেধ সত্বেও আমার পরিবার থেকে বেশ কিছু টাকা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
৪০ দিন মতো আমাকে জেলে থাকতে হয়।
ছাত্রলীগকে এই অসীম নির্যাতনের লাইসেন্স খালি পুলিশ না, বরং ভিসি আর শিক্ষকদেরই দেওয়া। পুরো প্রশাসনের সামনে আমাদের নির্যাতন করে ফেলে রাখা হয়, একজন শিক্ষকও আমাদের জন্য এগিয়ে আসেননি। প্রতিবাদ করেননি।
এর কিছুদিন পরেই আমার ডিপার্টমেন্টেরই একজন শিক্ষক ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হয়ে খুন হন। অথচ তখনই যদি শিক্ষকরা ছাত্রলীগের নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন, এই ঘটনা ঘটতে পারতো?
তবে এই ঘটনা আমাকে মানুষ চিনিয়েছে।
মানুষ ঠিক কতটা অনুভূতিশূণ্য পশু হতে পারে, সেটা আমাকে শিখিয়েছে।
এই ঘটনার পর থেকে বন্ধু বান্ধবরা উপরে উপরে আমাকে এড়াতে শুরু করলেও ভেতরে ভেতরে হেল্পফুলই ছিলো।
এলাকায় আমার তেমন কোন ঝামেলায় পড়তে হয়নি,কারণ ততদিনে সবাই জানতো যে মামলাগুলো রাজনৈতিক। এসবের কোন সত্যতা নাই।
তবে মৃত্যু হয়েছিলো আমার একটা স্বপ্নের।
আমাকে নির্যাতনের ঠিক পরদিন পত্রিকায় আমার একটা ছবি ছাপা হয়। ভয়ঙ্কর ছবি। নাক ঠোঁট ফুলে গেছে, চোখের নিচে কালো দাগ। দেখলে ভয় পাওয়ার কথা।
তবে সেদিন শুধু আমার চেহারা না, বরং আমার স্বপ্নটাও ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, যার ছবিটা কেউ কখনও দেখেনি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিলো সরকারি চাকরি করবো।
ছাত্রলীগের দেওয়া নাশকতার মিথ্যা মামলা আমার সেই স্বপ্নকে হত্যা করে ফেলে চিরতরে। আমার আর কোনদিন সরকারই চাকরির পরীক্ষা দেওয়া হয়নি।
দেশ স্বাধীন হয়েছে। অনেক কিছুর বিচার হচ্ছে। আমি শুধু অপেক্ষা করে আছি, আমার স্বপ্নকে গলাটিপে খুন করেছিলো যারা,তাদের বিচারটা দেখার জন্য!!
আল আমিন (মোয়ারজিন), ইইই’১৩
কুয়েট
ফুটনোট: ভিকটিমের উপরে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা ও নির্যাতনের সময়ে অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততা ‘সোচ্চার’ এর পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। তবে নির্যাতনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ভিক্টিমের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নি।
সম্ভাব্যশাস্তি: বাংলাদেশ দন্ডবিধি ৩০৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমানিত হলে নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ৩২৫ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন সাত বছরের কারাদন্ড ও জরিমানা হতে পারে।